প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে ‘বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭: অর্থনৈতিক প্রভাব, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনার
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে ‘বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭: অর্থনৈতিক প্রভাব, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনার
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজস্বনীতি, বিনিয়োগ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও বিশ্লেষণধর্মী চর্চা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ ‘বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭: অর্থনৈতিক প্রভাব, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে| ২০ জুলাই ২০২৬, সোমবার আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর এস. এম. নছরুল কদির| ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সহযোগী ডিনি প্রফেসর এম. মঈনুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষজ্ঞ বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন এবং ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর| প্রফেসর এস. এম. নছরুল কদির প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় বাজেটকে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন| তিনি বলেন, একটি বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির রূপরেখা নির্ধারণ করে| মাননীয় উপাচার্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে| তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করবে|
তিনি আগামী বছর প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে প্রাক জাতীয় বাজেট সেমিনার আয়োজন করবেন বলে জানান এবং জাতীয় বাজেটের আগে বাংলাদেশ সরকারকে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন|
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহযোগী অধ্যাপক ও ফিন্যান্স ডিসিপ্লিনের কো-অর্ডিনেটর জনাব রাজীব দত্ত, যিনি বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭-এর সামগ্রিক কাঠামো, রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা, করনীতি, উন্নয়ন বাজেট, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিবেশ, শিক্ষা খাত এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাজেটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তথ্যনির্ভর ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনা প্রদান করেন|
তিনি তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস| তিনি উল্লেখ করেন, ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি রাখা হয়েছে জিডিপির ৩.৬ শতাংশ, যা সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রচেষ্টার প্রতিফলন| তিনি আরও বলেন, সরকারের মোট রাজস্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে| তাই কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করের আওতা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট এবং কর পরিপালন বৃদ্ধি ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না|
উপস্থাপনায় বক্তা বাজেটের ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ করে বলেন, মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধ, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পুনরাবৃত্ত ব্যয়ে ব্যয় হওয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ে| তিনি কার্যকর সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন| বাজেটের অর্থায়ন কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বৃদ্ধি করেছে, যা একদিকে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে পারে, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় অধিক সতর্কতা ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করবে| সেমিনারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ|
বিশেষজ্ঞ বক্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর তাঁর প্রাঞ্জল, তথ্যনির্ভর ও বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্যে জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭-এর বিভিন্ন দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন| তিনি বলেন, একটি জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা| তাই বাজেট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সংখ্যাগত দিক নয়, বরং এর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং উন্নয়নমূলক প্রভাবও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন| তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের মধ্যে সরকার যে বাজেট প্রণয়ন করেছে, তা বাস্তবায়নে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা|
অধ্যাপক ড. সালেহ জহুর বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর অত্যধিক নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় চ্যালেঞ্জ| তিনি করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর পরিপালনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন| একই সঙ্গে তিনি করদাতাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন|
উচ্চশিক্ষা খাত প্রসঙ্গে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার হ্রাসের সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন| তিনি বলেন, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষক উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানে অধিক বিনিয়োগের সুযোগ পাবে| পাশাপাশি শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতা, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন|
সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর এম. মঈনুল হক বাজেটের বিভিন্ন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন| তিনি ভবিষ্যতেও এ ধরনের গবেষণাভিত্তিক ও সমসাময়িক বিষয়ক একাডেমিক আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে জানান|
সেমিনারে ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিনের কো-অর্ডিনেটর সহযোগী অধ্যাপক জনাব তাসনিম সুলতানা, মার্কেটিং ডিসিপ্লিনের কো-অর্ডিনেটর সহযোগী অধ্যাপক জনাব সুলতানা রাজিয়া চৌধুরী, অ্যাকাউন্টিং ডিসিপ্লিনের কো-অর্ডিনেটর সহযোগী অধ্যাপক ড. আহসান উদ্দিন, এইচআরএম ডিসিপ্লিনের কো-অর্ডিনেটর সহকারী অধ্যাপক জনাব রহিমা বেগম এবং ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ ও ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন|